ই-কার ব্যবহারের নিয়ম লেখ

Spread the love

ই-কার ব্যবহারের নিয়ম লেখ

মানুষ কথা বলার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে। কথার মূলে আছে কতকগুলা ধ্বনি। বাগযন্ত্রের সহায়তায় ধ্বনিগুলাে উচ্চারিত হয়। ধ্বনি উচ্চারণের জন্য যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করে সেগুলাে হল-ফুসফুস,স্বরতন্ত্রী,গলনালী, জিভ,মাড়ি, দাঁত, ঠোট, নাক ইত্যাদি। ফুসফুস থেকে বাতাস স্বরতন্ত্রী, মুখ বা নাকের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় জিভ, তালু, মাড়ি, দাঁত, ঠোঁট প্রভৃতিতে নানাভাবে বাধা পায় এবং তাতে বিভিন্ন ধ্বনি উচ্চারিত হয়। শব্দের মধ্যে ই-কার বা ঈ-কার উচ্চারণ খুব একটা পার্থক্য লক্ষ করা যায় না। তবে বানানের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। বানানের ক্ষেত্রে ই-কার ব্যবহারের নিয়ম নিম্নে দেওয়া হল-

১. তৎসম শব্দ যদি তদ্ভব শব্দে রূপান্তরিত হয় তাহলে শব্দের অন্তর্গত ঈ(ী) কার পরিবর্তন হয়ে ই -কার  হয়। যেমন , বংশী > বাঁশি,পক্ষী > পাখী > পাখি ,বাড়ী > বাড়ি, শাড়ী > শাড়ি, কুম্ভীর > কুমীর > কুমির, মৃত্তিকা > মাটি, মাঝী > মাঝি, শিউলী > শিউলি, হস্তি >ইত্যাদি।

২. স্ত্রীবাচক, অ-তৎসম শব্দে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : পিসি, মাসি, মামি, দাদি, চাচি, গিন্নি, বিবি, বৌদি, কাকি, জেঠি, ভাইঝি, দিদি ইত্যাদি।

৩. অর্ধ-তৎসম শব্দে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : রাত্তির, মিছে, ছিরি, বৃষ্টি, কৎসিৎ ইত্যাদি।

৪. বাংলা ক্রিয়াবাচক শব্দে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : করি, লিখি, ধরি, শিখি, পড়ি ইত্যাদি।

৫. বাংলা দেশি শব্দে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : পেঁকি, বাটি, ঘুড়ি, ডিঙি, ঝিঙা, বুড়ি, হুঁড়ি, ঢিলা, ঘড়ি, ছড়ি, চিল, ঝিনুক ইত্যাদি।

৬. বস্তুবাচক, ভাববাচক, কর্মবাচক এবং প্রাণিবাচক অ-তৎসম শব্দের শেষে ই-কার ব্যবহৃত হয়।যেমন : আলমারি, ওস্তাদি, চালাক, ডাকাতি, ডাক্তারি, মাস্টারি ইত্যাদি।

৭. আধুনিক বাংলা বানানের নিয়মানুযায়ী জাতি ও ভাষার নামের শেষে ই-কার ব্যবহার করা হয় । যেমন : বাঙালি, ইহুদি, জাপানি, হিন্দি, বিহারি, পাঞ্জাবি, আরবি, ইংরেজি ইত্যাদি।

৮. বিদেশি শব্দে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : কামিজ, কাহিল, অছিলা, দুনিয়া, মিছিল, খলিফা,শাহদ, খতিয়ান ইত্যাদি।

৯. ইংরেজি শব্দে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : টেবিল, পুলিশ, সিস্টার, মিস্টার, স্টিমার, ব্রিটিশ, ক্রিকেট, ডিগ্রি, পেন্সিল, অফিস ইত্যাদি।

১০. ব্যতিহার ক্রিয়ার ক্ষেত্রে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : কানাকানি, হাতাহাতি, রক্তারক্তি, দলাদলি, হাসাহাসি, মারামারি, গলাগলি, লাঠালাঠি, বলাবলি, ঠেলাঠেলি, কোলাকুলি, ইত্যাদি।

১১. প্রাণিবাচক অতৎসম শব্দের শেষে সাধারণত ই-কার বসে। যেমন : তিমি, হাতি, প্রজাপতি, বুলবুলি, জোনাকি ইত্যাদি।

১২. জীব, বস্তু, গুণ, ভাব ও কর্মবাচক শব্দে ই-কার বসে। যেমন : বেঙাচি, বেজি, কাঠি, মিষ্টি, খুঁটি, পাগলামি, কেরানি, বাবুগিরি, চুরি, কেরামতি ইত্যাদি।

১৩. সংকৃত ‘ইন’ (ঈ =ী) প্রত্যয়ের শেষে বর্ণ বা শব্দ যুক্ত হলে ঈ-কারের স্থলে ই-কার হবে । যেমন : মন্ত্রী + ত্ব = মন্ত্রিত্ব, প্রতিযােগী + তা = প্রতিযােগিতা, জীবী + ক = জীবিকা, প্রতিদ্বন্দী + তা = প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইত্যাদি।

১৪. সমাসের ক্ষেত্রে দুটি অর্থপূর্ণ শব্দ একত্রিত হলে প্রথমােক্ত ঈ-কার ই-কারে পরিণত হয়। যেমন : গুণী + গণ = গুণিগণ, প্রাণি + বিদ্যা = প্রাণিবিদ্যা, স্বামী +গৃহ = ইত্যাদি।

১৫. বহুল প্রচলিত কিছু শব্দে সাধারণত ই-কার বসে। যেমন : অঞ্জলি, গীতাঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি।

১৬. পদাশ্রিত নির্দেশক (Article) টি-তে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : বইটি, কলমটি, হাতিটি গরুটি, লােকটি, ছেলেটি, শিশুটি, গানটি, কথাটি, বােনটি, ভাইটি ইত্যাদি।

১৭. তৎসম শব্দের শেষে বিশেষণবাচক ই’ প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দের শষে ই-কার বসে। যেমন : চালাকি, কয়েদি, খেয়ালি, গােলামি, কেতাবি, মেহনতি, বুনিয়াদি, শরিয়তি ইত্যাদি।

১৮. শব্দের শেষে উরি, উনি, আলি, আনি, আরি, আমি, ইমা, তি, মি প্রভৃতি প্রত্যয় যুক্ত হলে কার ব্যবহার করা হয়। যেমন : ধুনুরি, রাধুনি, ঘটকালি, দুয়ানি, কাটারি, রকমারি, নীলিমা, কালিমা, চন্দ্রিমা, লালিমা, কাটতি, চলতি ছেলেমি ইত্যাদি ।

১৯. সংস্কৃত ‘ক্তি’ প্রত্যয়জাত শব্দে ‘তি’-র ক্ষেত্রে ই-কার বসে। যেমন : উক্তি, কীর্তি, ভীতি, মুক্তি, শান্তি, স্মৃতি, বিকৃতি, প্রকৃতি, আবৃত্তি, ক্ষতি, গতি, খ্যাতি, গীতি, জাতি ইত্যাদি।

২০. বিশেষণসূচক ও স্ত্রীবাচক ‘ঈ’ প্রত্যয়ান্ত সংখ্যাবাচক শব্দগুলাে ছাড়া সাধারণ সংখ্যাবাচক শব্দের বানানে ই-কার বসে। যেমন : তিন, আশি, কোটি, চল্লিশ, ত্রিশ, বিশ ইত্যাদি।

২১. ব্যক্তিবাচক অ-তৎসম শব্দে ই-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন : মৌলভি, মুহুরি, পাদ্রি, কেরনি ইত্যাদি।

২২. স্ত্রীবাচক লক্ষ্মী, কালী, ৬ষ্ঠী শব্দের পরে “দাস’ যুক্ত হলে মূলশব্দের ঈ-কার ই-কার হয়ে যায়। যেমন : কালিদাস, লক্ষ্মিদাস, ষষ্ঠিদাস ইত্যাদি।

1 thought on “ই-কার ব্যবহারের নিয়ম লেখ”

  1. Pingback: বাংলা ভাষার ইতিহাস ও ব্যবহারিক বাংলা সাজেসন্স | Cholo Shekhe

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top