Spread the love

দেশপ্রেম/ স্বদেশপ্রেম প্রবন্ধ রচনা

প্রতিটি মানুষের কাছে জন্মভূমি অত্যন্ত প্রিয়। মা যেমন আদর স্নেহ মমতা দিয়ে সন্তানকে লালন-পালন করে, তেমনি ভাবে দেশ আমাদের ধরিত্রীর সন্তান হিসেবে বিশ্বমাঝে লালন করে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার নিজের দেশকে ভালোবাসে। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালবাসায় হল দেশপ্রেম।

ভূমিকা:

সার্থক জনম  আমার জন্মেছি এই দেশে
সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে
-(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

প্রতিটি মানুষের কাছে জন্মভূমি অত্যন্ত প্রিয়। মা যেমন আদর স্নেহ মমতা দিয়ে সন্তানকে লালন-পালন করে, তেমনি ভাবে দেশ আমাদের ধরিত্রীর সন্তান হিসেবে বিশ্বমাঝে লালন করে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার নিজের দেশকে ভালোবাসে। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালবাসায় হল দেশপ্রেম। পৃথিবীর বিরাট এই আয়োজনে সৃষ্টি ও স্রষ্টা কে ভালোবাসার নামও  দেশপ্রেম। যে দেশে আমরা জন্মগ্রহণ করি তার আলো-বাতাস আমাদেরকে তিলে তিলে বড় করে তোলে, সে দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সৃষ্টি হয়। দেশকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আমরা দেশপ্রেমের পরিচয় দিতে পারি। তাই প্রতিটি মানুষের কাছে জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও অধিক প্রিয় হয়ে ওঠে। দেশপ্রেম মানব জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

দেশপ্রেম কী:  যে মা আমাদেরকে দীর্ঘ কষ্টভোগের পর জন্ম দিয়ে থাকে তাকে যেভাবে ভালোবাসি ঠিক একইভাবে স্বদেশকেও আমরা সমানভাবে ভালোবাসি। দেশপ্রেম একটি মহৎ গুণ। জন্মগ্রহণ করা স্বভূমিকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করার পাশাপাশি সেই ভূমির সকল মানুষকে যদি ভালোবাসা যায় তবেই তাকে দেশপ্রেম বলা যাবে। নিজের দেশ, জাতি , ভাষা ও মানুষের প্রতি গভীর অনুভূতির নামই দেশপ্রেম  বা স্বদেশপ্রেম। প্রকৃত দেশপ্রেমিক স্বদেশের প্রতি প্রচণ্ড দায়বদ্ধ থাকে ফলে স্বদেশের মঙ্গল হোক এমন সকল কাজ তিনি করতে পারেন। নিজের দেশকে ভালোবাসা এবং জন্মদাত্রী মাকে ভালোবাসা একই বিষয়। 

দেশপ্রেমের স্বরূপ: মানুষ যদি নিজেকে ভালবাসতে পারে তবেই সে নিজের দেশকে ভালবাসতে পারবে। ভালোবাসার অনুভূতি হৃদয়ে জাগরিত হলেই স্বদেশপ্রেমের অনুভূতি হৃদয়ে জেগে উঠবে। স্বদেশপ্রেম থেকেই সৃষ্টি হয় বিশ্বপ্রেম আর বিশ্বপ্রেমিক হয়ে ওঠে মানবপ্রেমিক বা মানব কল্যাণকামী। নিজের দেশের সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন সৃষ্টি হয় ফলে ব্যক্তির দেহ মনে স্বদেশের অতিক্ষুদ্র উপাদানও প্রভাব বিস্তার করে। স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে থাকে দায়িত্ব ও কর্তব্য বোধের ছোঁয়া। মা, মাটি ও মানুষকে ভালবাসার মধ্যে রয়েছে দেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্য ।দেশকে ভালোবাসার এ আবেগকে মানুষ বিভিন্নভাবে প্রকাশ করে থাকে। শিল্প ও সাহিত্য রচনা, ছবির ক্যানভাস, বিচিত্র শব্দের ব্যবহার, দুর্যোগে  বীরত্ব  দেখানোসহ বিভিন্ন ভাবে দেশপ্রেমের এক একটি ধারা প্রকাশ পায়।

দেশপ্রেমের প্রেরণা:

“মিছা মনিমুক্তা হেম স্বদেশের প্রিয় প্রেম
তার চেয়ে রত্ন নাই আর।”
-(ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত)

 দেশের থেকে প্রিয় আর কোন ভূমি হতে পারে না। স্বদেশের কারণেই আমরা পেয়ে থাকে আমাদের পরিচয় তাই সবসময় স্বদেশের প্রতি আমরা ঋণী থাকি । নিজের ধন,মান, যশ এমনকি জীবন দিয়েও দেশের সম্মান রক্ষা করার চেষ্টা করা উচিত। চিন্তা, কথায় ও কাজে  দেশের জন্য যে ভালোবাসা প্রকাশ পায় সেটি প্রকৃত ভালোবাসা। মানুষের শরীরের সঙ্গে শিরা-উপশিরার যে সম্পর্ক থাকে একটি দেশের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের সেই একই রকম সম্পর্ক তৈরি হয়। দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বড় আপন মনে হয়। দেশমাতৃকার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়েই দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সভ্য সমাজের প্রায় প্রতিটি মানুষ স্বদেশকে ভালোবাসবে এবং স্বদেশের মঙ্গলার্থে যেকোনো কাজ করতে প্রস্তুত থাকবে। 

দেশপ্রেমের প্রকাশ:  

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি
-(দ্বিজেন্দ্রলাল রায়)

নিজ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দেশকে ভালোবাসতে গেলে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রথমে স্বীকার করতে হবে। বিদ্যা শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। নিজের অবস্থান থেকে দেশের সম্মান বৃদ্ধি হয় এমন কাজ করতে হবে।  দেশকে ভালোবাসার জন্য অনেক অর্থবিত্তের প্রয়োজন আছে এমন  ভাবা যাবে না। দেশকে ভালোবাসতে গেলে মহৎ হৃদয় থাকতে হবে। ব্যক্তিভেদে দেশপ্রেমের প্রকাশ বিচিত্র রকম হতে পারে। দেশের বৃহৎ স্বার্থের জন্য যেমন আত্মত্যাগ করতে হতে পারে তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ সামষ্টিক ভাবে দেশের স্বার্থকে বৃহৎ করেতে পারে। মানুষ তার অবস্থান অনুসারে, নিজের ক্ষমতা অনুসারে স্বদেশপ্রেমের  প্রকাশ ঘটাতে পারে।  স্বদেশভূমি যখন বিপদের সম্মুখীন হয় দেশপ্রেম প্রকাশ এর সবচেয়ে উপযুক্ত সময় তখনই। দেশকে যে কোন বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একজন দেশপ্রেমিক সদা প্রস্তুত থাকে ।দেশকে ভালোবাসা দেশের প্রতি ঋণ শোধের উপায় মাত্র।

দেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্য:  প্রতিটি মানুষ নিজ দেশের সুনামে যেমন সুখ অনুভব করে তেমনি দেশের খারাপ সংবাদ তাকে আরো বেশি দুঃখ অনুভব জাগিয়ে দেয়। দেশপ্রেমিক ব্যক্তি স্বদেশকে নিজের জীবনের চেয়ে অধিক মূল্যবান মনে করে। শর্তহীনভাবে প্রকৃত দেশপ্রেমিক দেশের পাশে থাকে। বন্য পশুকে যদি লোকালয়ে নিয়ে আসা হয় সে কখনোই উন্মুক্ত ভাবে  বা স্ব-ইচ্ছায় লোকালয়ে থাকবে না, আবার মানুষকে যদি বন্য জীবনে ফিরে যেতে বলি তাহলে সে কোনভাবেই বনে যেতে রাজি হবে না ।   প্রতিটি প্রাণী নিজের আবাসস্থল এর প্রতি জন্মগত ভাবেই ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। দেশ প্রেমিক মানুষ স্ব-ভূমি, স্ব- জাতির প্রতি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকে। দেশ প্রেমিক দেশের মানুষকে ভালোবাসে একইসঙ্গে দেশের গৌরব আকাঙ্ক্ষায় উচ্চাভিলাষী থাকে।

দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত: একজন জননীকে সন্তান যেমন ভালোবাসে ঠিক তেমনি ভাবে স্বদেশে  জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষ  নিজের দেশকে ভালোবাসে।  কবির ভাষায় বলতে গেলে-  সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি এই অভিব্যক্তি  আমাদের মনে জেগে ওঠে। দেশ আয়তনে যাত ক্ষুদ্র বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হোক না কেন সেটি ওই দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান। স্বদেশকে রক্ষার জন্য ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত দেশপ্রেমের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বাঘাযতীন, প্রীতিলতা, সূর্যসেন তিতুমীর ভারতীয় উপমহাদেশে  দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই মানুষগুলোর সাহস ও আত্মত্যাগের তুলনা  কোন কিছুর সঙ্গে চলে না। বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে ভাষার মান রাখতে সালাম, বরকত রফিক জব্বার সহ নাম না জানা অনেক মানুষ ১৯৫২ সালে রাজপথে দিয়েছে রক্ত। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানের শাসক শ্রেণিকে  পর্যদুস্ত করে দিয়েছিল নির্ভীক দেশ প্রেমিক বাঙালী। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ  দেশপ্রেমিক প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, স্বদেশের জন্য সম্ভ্রম হারিয়েছে ২ লক্ষ মা -বোন। দেশের সকল স্বার্থকে ঊর্ধ্বে রেখেই দেশপ্রেমিক জীবনকে চালিত করে। দেশের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য দেশপ্রেমিক সর্বদা চিন্তার পাশাপাশি কর্মও করে। মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু  প্রমুখ আত্মত্যাগী মানুষ আজও আমাদের দেশকে ভালবাসতে অনুপ্রেরণা দিয়ে চলেছে। প্রাচ্যের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের দেশসমূহ লেলিন , স্টেলিন, মাও সেতুং, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং  স্বদেশকে ভালবেসে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। সারা পৃথিবীতে যখন মহামারী করোনাভাইরাস এর প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে তার হাত থেকে বাংলাদেশও রেহাই পায়নি। করোনার প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ। কর্মহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকার বিত্তবানদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই আহবানে সাড়া দিয়ে গত ২১ এপ্রিল মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে শেরপুরের ঝিনাইগাতী এলাকার ৮০ বছর বয়সী ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিন নিজের ভাঙা ঘর মেরামতের জন্য ভিক্ষা করে দুই বছর ধরে জমানো নগদ দশ হাজার টাকা অনুদান দেয়। মানুষকে ভালোবেসে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নাজিম উদ্দিন। করোনা কালে স্কুলের শিক্ষার্থীরা টিফিন থেকে জমানো টাকা স্থানীয় ত্রাণ তহবিলে জমা দিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। বিদ্যানন্দন ফাউন্ডেশন বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করে দরিদ্র মানুষকে, পলান সরকার পায়ে হেঁটে মানুষের বাড়িতে বাড়িকে বিনামূল্যে বই পৌছে দিয়েছেন জ্ঞান বিকাশের জন্য। নিঃস্বার্থভাবে এই মানুষগুলো দেশকে ভালোবেসেছে এবং দেশের ক্রান্তিকালে মানুষের পাশে  দাঁড়িয়েছে। তাঁদের আদর্শ আমাদের অনুসরণ করা উচিত।

দেশপ্রেমের মাধ্যম: দেশপ্রেম প্রকাশের মাধ্যম দেশ এবং দেশের মানুষকে ভালোবাসা।একজন ব্যক্তির সকল প্রাপ্তির পেছনে দেশের অবদান  থাকে তাই সে  দেশের জন্য সকল কিছু বিসর্জন দিতে পারে।  দেশে যখন কোন সমস্যা থাকে না তখন দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো একটু অসম্ভব কিন্তু দেশে যখন সমস্যা দেখা দেয় তখনই দেশপ্রেম প্রকাশের উত্তম সময় উপস্থিত হয়। শাসকশ্রেণীর নির্যাতন,  দমন-পীড়ন  সহ্য করে উপেক্ষিত জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। দেশকে  শত্রুমুক্ত করার মাধ্যমে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটানো যায়। ধর্ম, বর্ণ ,জাতি নির্বিশেষে মানুষ যখন মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে  তখনই দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। দেশের ক্রান্তিকালে দেশের পাশে থাকার মাধ্যমেই স্বদেশ প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

দেশপ্রেমের অনুভূতি:  যুগে যুগে দেশে দেশে সংগ্রামী মানুষ দেশকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে  স্বদেশের জয়গান করেছেন, জয়গান করেছেন মানব কল্যাণে। দেশের জন্য কাজ করতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়। একজন দেশপ্রেমিকের সবচেয়ে সুখের অনুভূতি তখনই সৃষ্টি হবে যখন  তিনি  স্বদেশের জন্য কোন অবদান রাখতে  পারেন। দেশপ্রেমের অনুভূতি সংজ্ঞায়িত করা একেবারেই অসম্ভব এটি মানুষের চেতনাগত বিষয়।  স্বদেশের গৌরব, সুনাম দেশপ্রেমিকের আনন্দ অনুভূতির কারণ হবে যদি এর বিপরীত হয় তা হবে দেশপ্রেমিকের জন্য বেদনার। দেশপ্রেমের অনুভূতি কবি জীবনানন্দ দাশ প্রকাশ করেছেন এভাবে-  

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি
তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।

দেশপ্রেমের প্রয়োজনীয়তা: দেশের প্রতি মমত্ববোধ বা ভালোবাসা ব্যতীত ব্যক্তিজীবনকে কখনই সার্থক ও সুন্দর করা সম্ভব নয়। দেশের সাফল্য ও সুনাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিটি মানুষের দেশপ্রেমিক হওয়া একান্ত প্রয়োজন। দেশের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে দেশপ্রেমিককে কাজ করতে হবে। দেশের সমৃদ্ধি অর্জনে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রতিযোগিতাপূর্ণ  পৃথিবীতে স্বদেশের  সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা পেতে প্রতিটি নাগরিকের দেশপ্রেমিক হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। দেশকে যদি আমরা ভালো না বাসি দেশের প্রয়োজনে তার পাশে না থাকি তবে নিজের জন্মভূমি তার সন্মান হারাবে যা প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয় হবে। মনুষ্যত্ববোধের জাগরণ ঘটিয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের দেশপ্রেমিক হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। দেশপ্রেম ছাড়া কোনভাবেই একটি দেশ জ্ঞান, ধন ও মানে উন্নতি করতে পারে না ফলে দেশপ্রেমের বিকল্প কিছু নেই।

দেশপ্রেম ও রাজনীতি: প্রকৃত রাজনীতিবিদ হতে গেলে দেশপ্রেম ছাড়া কোনভাবেই সম্ভব না। রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য থাকবে মানব কল্যাণ যা প্রকারান্তরে দেশের কল্যাণকে প্রতিনিধিত্ব করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলেও বর্তমানে আমাদের কিছু রাজনীতিবিদ যারা দেশপ্রেমের  দীক্ষা না নিয়ে আত্ম ভোগের দীক্ষা নিয়েছে। দেশের স্বার্থকে পেছনে ফেলে নিজের স্বার্থকে বড় করে  দেখছে। যে রাজনীতি মানুষের কল্যাণ্যের জন্য সেই রাজনীতি মূলত দেশের কল্যাণ্যের জন্যই। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটলে দেশের পরিবর্তন ঘটবে তাই প্রকৃত রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অন্যতম মূলমন্ত্র দেশপ্রেমিক হওয়া। 

দেশপ্রেমের শিক্ষা: দেশপ্রেমের প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের সময় ছাত্র জীবন। ছাত্র জীবনে মানুষের পিছুটান কম অনুভূত হয়। দেশের জন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে এ বয়সীরা একেবারে পিছপা হয় না। ছাত্রজীবনে চিন্তার ধারা থাকে অত্যন্ত ক্ষুরধার ফলে দেশকে ভালোবাসার দীক্ষা এ সময়ে নেওয়া সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত হবে। দেশপ্রেমের মানসিকতা মানুষকে অর্জন করে নিতে হয়। আজকে যে ছাত্র সেই আগামী দিনের দেশ পরিচালনাকারী তাই ছাত্রজীবনেই দেশপ্রেমের মূলমন্ত্র গ্রহণ করতে হবে।  ছাত্রজীবন ব্যতীত দেশকে ভালোবাসার চিন্তা সম্ভব নয় এমন বলা যাবে না।পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক উদাহরণ রয়েছে যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ ছাড়াও নিজের মধ্যে দেশপ্রেমের মন্ত্র দ্বারা নিজেকে উজ্জীবিত করেছে। তাই দেশপ্রেমের শিক্ষা মূলত আত্মবোধ থেকে সৃষ্টি ।

সাহিত্যের আলোকে দেশপ্রেমের পরিচয়: মনের ভাব লিখে প্রকাশ করার শৈল্পিক মাধ্যমকেই সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্ব সাহিত্যে সৃষ্টি হয়েছে বহুবিচিত্র গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অক্ষয় কুমার দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,  কাজী নজরুল ইসলাম ,জীবনানন্দ দাশ,  শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক সহ অনেক সাহিত্যিক তাদের সৃষ্টিকর্মে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে  প্রচারিত গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা যুগিয়েছে। গানের গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই মর্মস্পর্শীভাবে গানের প্রতিটি ধারা সৃষ্টি করেছেন। সাহিত্যিকের কাজ সাহিত্যের আলোকে মানুষের মাঝে দেশপ্রেমের জাগরণ সৃষ্টি করা।

দেশপ্রেমের প্রভাব:  দেশপ্রেমের প্রভাবে ব্যক্তির মহৎগুণাবলী প্রকাশ পায়। দেশপ্রেমের প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা নিজের দেশের  সবকিছুকেই প্রভাবিত করে।  দেশকে শত্রুমুক্ত করতে দেশপ্রেমের প্রভাব যেমন প্রয়োজন হয় তেমনি দেশের অর্থনৈতিক পুনঃর্গঠনেও  দেশপ্রেমের প্রভাব বিদ্যমান। আবার প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে দেশপ্রেমের প্রভাব রয়েছে । একজন দেশপ্রেমিকের প্রভাবে একজন খারাপ মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে সত্য পথে ধাবিত হতে পারে। ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে দেশপ্রেমের প্রভাব রয়েছে।স্বদেশকে ভালোবেসেই মানুষ বিশ্বসংসার ভালবাসতে শেখে। দেশপ্রেমের প্রভাবে  মহৎ গুণ সম্পন্ন মানুষ হওয়া যায়। 

বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি ও স্বদেশপ্রেম: আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক ও সমাজ জীবনে বৃহৎ পরিবর্তন এসেছে। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে,  গ্রাম ছেড়ে শহরে বসবাস করার প্রবণতা বাড়ছে। মানুষে মানুষে প্রাণের মিল বর্তমান সমাজে কমতে শুরু করেছে। প্রতিটি মানুষ শুধু নিজের কথাই চিন্তা করছে ফলে সমাজে একটি বিচ্ছিন্নতা  সৃষ্টি হচ্ছে। সামাজিক এমন পরিস্থিতিতে দেশপ্রেমের  চেতনা সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন।  সমাজে  বসবাসরত মানুষের কল্যাণ হয় এমন কাজ আমাদের করা উচিত। শুধু নিজের জন্য নয় দেশ ও দশের জন্য ভাবতে হবে। মানুষের জন্য কাজ করা মানেই দেশের জন্য কাজ করা। তাই সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করে দেশ ও জাতির  কল্যাণের  মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

দেশপ্রেমের উগ্রতা:  দেশপ্রেম মানুষের একটি উন্নত চরিত্রের পরিচয় বহন করে। প্রকৃত দেশপ্রেমিক শুধু নিজের দেশের চিন্তার পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বের মানুষের কথা চিন্তা করে কিন্তু  উগ্র দেশপ্রেম শুধু স্বদেশের জাতীয়তাকে বা  শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় ।  এমন উগ্রতা পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্যের কিছু দেশ তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য নিষ্ঠুর আচরণ করে। নিজেদের শক্তি সামর্থ্য ও শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে অন্য দেশের উপর অন্যায় আক্রমণ করে এমনকি মানুষ হত্যা করতেও তারা একবিন্দু ভাবে না। উগ্র মানসিকতা বজায় থাকলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। উগ্র জাতীয়তাবাদ বা উগ্র দেশপ্রেম  অশান্তি ও অকল্যাণ বয়ে আনে তাই এমন মানসিকতা পরিহার করা উচিত।

দেশ প্রেম ও আমাদের কর্তব্য: পৃথিবীতে মানুষের  বসবাস উপযোগী করে তোলার জন্য বহু হৃদয়ের মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই দেশপ্রেমিক মানুষেরা তাদের আদর্শ স্থাপন করে রেখেছেন। এই মহৎ হৃদয়ের মানুষগুলো পৃথিবীতে করতে চেয়েছেন শান্তির নীড়। আমাদের কর্তব্য হলো মহৎ হৃদয়ের মানুষগুলোর আদর্শ ধারণ করে তাদের ভাবনা গুলোকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা যা দেশ ও সমগ্র বিশ্বের কল্যাণ বয়ে আনবে। দেশপ্রেমিক মানুষকে সম্মান জানাতে হলে তার আদর্শকে সম্মান দিতে হবে পাশাপাশি তার আদর্শ প্রচার ও প্রসারে  নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আজকের পৃথিবী থেকে হিংসা, হানাহানি, অশান্তি দূর করতে হলে আদর্শ দেশপ্রেমিকের চিন্তা চেতনা সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। 

উপসংহার: “দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ”-  এই বাণীকে ধারণ করে স্বদেশের কল্যাণে প্রতিটি মানুষকে নিয়োজিত থাকতে হবে। দেশপ্রেমিক মানুষের মূল লক্ষ্য হবে মানুষকে ভালোবাসা। নিজ দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই স্বদেশের জন্য কাজ করতে হবে। দেশপ্রেমকে  রূপান্তরিত করতে হবে মানবপ্রেমে। প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষ সমগ্র পৃথিবীর মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানীয়। নিজের স্বার্থ পরিহার করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। দেশপ্রেমের মত মহৎ গুণ  ধারণ করে দেশ ও জাতির জন্য কিছু অবদান রাখতে পারা একজন দেশপ্রেমিকের মূল কর্তব্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top