বাংলা বানান সংস্কারের নানা উদ্যোগ সম্পর্কে আলোচনা কর

Spread the love

বাংলা বানান সংস্কারের নানা উদ্যোগ সম্পর্কে আলোচনা কর

’বানান’ কথাটির অর্থ শব্দের বর্ণ বিশ্লেষণ। বানান বলতে কোন শব্দের ব্যঞ্জনবর্ণ ও স্বরবর্ণের সংযােগে উচ্চারণ বেঝায়। বানানকে বলা হয়েছে ‘শব্দ মধ্যস্থ বর্ণসমূহের ক্রমিক বর্ণন’। বানান শব্দের উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত ‘বর্ণ’ শব্দ থেকে। বর্ণ মিলে হয় শব্দ। এক কিংবা একাধিক ধ্বনির সমন্বয়ে তৈরি অর্থবােধক ও উচ্চারণযােগ্য একককে বলা হয় শব্দ। শব্দ স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। আবার একাধিক শব্দ মিলে বাক্যে রূপ নেয়। শব্দ খুব ছােট হতে পারে, আবার বেশ বড়ও হতে পারে। যেমন – এ, ও, মন, মানিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রত্যুৎপন্নমতি। শব্দ সহজ সরল হতে পারে, আবার জটিলও হতে পারে।

যে কোন শব্দে ব্যবহৃত বর্ণগুলাের বিশ্লেষণ হল বানান। বানান মুখে উচ্চারণের বেলায় হতে পারে। লেখার বেলায় হতে পারে। কোনাে কোনাে বর্ণের উচ্চারণ এক এক রকম থাকায় উচ্চারণের সময় বানানের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা যায় না যেমন- ‘বর্ণনা’ উচ্চারণ করলে কোনটা মূর্ধন্য ণ, কোনটা দন্ত্য ন তা উচ্চারণে বােঝা যায় না। কিন্তু লিখিত হলে নির্দিষ্ট বর্ণই ব্যবহার করতে হয়। নইলে বানান ভুল হবে।

বাংলা ভাষায় লেখালেখির শুরু থেকেই বানানে শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয় নি। বাংলা সাহিত্যের প্রথম যুগের নিদর্শন চর্যাপদের লিখিত রূপের নমুনা পাওয়া গেছে। পরবর্তী পর্যায়ে মধ্যযুগের বিপুল পরিমাণ সাহিত্যসৃষ্টির লিখিত রূপ বর্তমান। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের লিখিত রূপের মধ্যে বানানে বৈচিত্র্য রয়েছে। সে আমলে একটি আদর্শ বানান পদ্ধতি অনুসরণ করার মত ব্যবস্থা ছিল না। এমন কি অক্ষরের আকারও সবসময় একরকম ছিল না। কবিগণের নিজের হাতের লেখা পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি। পাওয়া গেছে লিপিকরদের হাতের লেখা পাণ্ডুলিপি। লিপিকরেরা নিজের খেয়াল-খুশিমত লিখেছেন। ১৮০১ সালে খ্রিস্টান পাদ্রিদের উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশনে প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হলে ছাপার অক্ষরে মুদ্রিত বইয়ের মাধ্যমে বাংলা বানানের রূপ নির্দিষ্ট হয়। সময়ের আবর্তে বাংলা বানান নিয়ে নানা রকম সমস্যা দেখা দেওয়াতে বানান সংস্কার করা জন্য নানা রকম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলা বানানে অসমতা বিরাজ করুক তা কারও অভিপ্রেত নয়। সে জন্য বানানে শৃঙ্খলা আনয়নের লক্ষে বহুদিন থেকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ও ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলা বানানে সমতা বিধান করা সম্ভব হয় নি। বাংলা বানানে সমতা বিধানের জন্য যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে সে সম্পর্কে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বাংলা বানান অভিধানে নিম্নরূপ মন্তব্য করা হয়েছে –

দীর্ঘকাল যাবত বাংলা বানান সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুশাসন অনুযায়ী চলে আসছিল। উনিশ শতকের গােড়ায় বাংলা গদ্যরীতিতে তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন থেকে ক্রমান্বয়ে অ-তৎসম শব্দের বানানে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে আরম্ভ করে।

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে বিশ্বভারতী চলতি ভাষার বানানের একটি নিয়ম স্থির করে। রবীন্দ্রনাথের অনুমােদনক্রমে বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলি ঐ বানানরীতি অনুসরণে মুদ্রিত হতে থাকে। এরপর ১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথের অনুরােধে ‘কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান সংস্কার সমিতি’ গঠিত হয়। ৮ মে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানানের নিয়ম প্রকাশ করে এবং তার পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণ বের করে ১৯৩৭-এর মে মাসে। বিশ্বভারতী বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রচারিত বাংলা বানানের নিয়মকানুন দেশের শিক্ষিত সমাজের প্রশ্নাতীত সমর্থন যেমন পায় নি, তেমনি সৃজনশীল সাহিত্যিকবর্গও তা সর্বাংশে মান্য করেন নি ; ফলে বানানের বিশৃঙ্খলা রয়েই গেল।

১৯৪৯ সালে তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ সরকার মৌলানা মােহাম্মদ আকরম খাঁ-র নেতৃত্বে East Bengal Language Committee গঠন করে। এ কমিটি গঠনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের মানুষের প্রতিভা ও কৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা এবং সে-লক্ষ্যে বর্ণমালা-সংস্কার, বানান-সংস্কার, লিপি-সংস্কার (আরবি বা রােমান হরফে লেখা) ইত্যাদি প্রসঙ্গ বিবেচনা করা। পরবর্তী পর্যায়ে অবশ্য পূর্ববঙ্গ সরকার এ কমিটির রিপাের্ট প্রকাশ সমীচীন মনে করে নি। রিপাের্টটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন প্রবর্তিত হবার পর।

১৯৬৩ সালে পুনরায় বাংলা একাডেমির তদানীন্তন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের নেতৃত্বে বানান-সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি বাংলা বর্ণমালা থেকে ঙ, ঃ, ঈ এবং -ীকার বাদ দেবার সুপারিশ করে। ২৮ মার্চ ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ব্যক্তিগত আগ্রহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পর্ষদ বাংলা ভাষা, ব্যাকরণ ও বর্ণমালা সংস্কারের জন্য আরও একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটি শিক্ষা পর্ষদের বিবেচনার জন্য একটি সুপারিশ পেশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সুপারিশটি গ্রহণ করলেও কখনও এ কমিটির রিপাের্ট প্রকাশ করে নি। 

১৯৮০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বানানের নিয়ম সমিতি’ বাংলা বর্ণমালা থেকে ঙ, ঞ, ণ, ঈ-কার এবং য-ফলা বাদ দেবার প্রস্তাব করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বানানের নিয়ম সমিতি ‘র এ প্রয়াস সফল হয় নি।

১৯৯১ সালে আনন্দ পাবলিশার্স নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সম্পাদনায় বাংলা কী লিখবেন কেন লিখবেন নামে আনন্দবাজার পত্রিকা নিজস্ব ব্যবহার-বিধি প্রকাশ করে। এ ছাড়াও উভয় বঙ্গে ভাষা বা বানান সংস্কারের কয়েকটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নেয়া হয়। এঁদের মধ্যে আবুল হাসানাৎ, আবুল কাসেম, মােফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মুহম্মদ ফেরদাউম খান, জগন্নাথ চক্রবর্তী প্রমুখের প্রয়াস বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। 

বাংলা একাডেমির ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’-এ (ডিসেম্বর ১৯৯২, পরিমার্জিত সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৯৪) বানান বা লিপি সংস্কারের প্রয়াস করা হয় নি। কেবল বানানকে অভিন্ন ও প্রমিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর আগে পাঠ্যপুস্তকে বাংলা বানানের সমতা বিধানের লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বাের্ড-এর উদ্যোগে কুমিল্লায় (২১-২৩ অক্টোবর ১৯৮৮) একটি কর্মশিবির অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লা কর্মশিবিরে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলােকে ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বাের্ড ড. আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় ‘পাঠ্য বইয়ের বানান’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। এ পুস্তিকায় লিপিবদ্ধ নিয়ম অনুসরণ করে বাের্ডের বিদ্যালয়পাঠ্য পুস্তকাদি মুদ্রিত হতে আরম্ভ করে।

বাংলা একাডেমি কোনােরূপ বানান সংস্কারের প্রয়াস করে নি, কেবল দু-একটি ক্ষেত্রে বিকল্প বর্জন করেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বাের্ড অনুসৃত নিয়মাবলির দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে সবই একাডেমি গ্রহণ করেছে। বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম বিশ্বভারতী ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানানের নিয়ম থেকে খুব দূরবর্তী নয়।

অসংখ্য সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ বাংলা ভাষায় অঙ্গীভূত হয়ে আছে। এসব শব্দের বানান সংস্কৃত ব্যাকরণ অভিধানের শাসনে সুনির্দিষ্ট হয়েছে, সে জন্য তাতে হস্তক্ষেপ করা হয়নি। নবাগত বা অল্প পরিচিত বিদেশি শব্দ সম্মন্ধে বিশেষ বিচার আবশ্যক। এ ধরনের শব্দের বাংলা বানান এখনও সর্বজনগৃহীত রূপে নির্ধারিত হয়নি। তাই সাধারণের যথেচ্ছাচারের ওপর নির্ভর না করে বানানের সরল নিয়ম গঠন করা কর্তব্য।

3 thoughts on “বাংলা বানান সংস্কারের নানা উদ্যোগ সম্পর্কে আলোচনা কর”

  1. Pingback: বাংলা ভাষার ইতিহাস ও ব্যবহারিক বাংলা সাজেসন্স | Cholo Shekhe

  2. সুহৃদ

    বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র হ্রস্ব স্বরবর্ণ ব্যবহার অযৌক্তিক ও অর্বাচীন সুলভ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top