Spread the love

অধ্যবসায় প্রবন্ধ রচনা

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। জ্ঞান বিবেক-বুদ্ধিকে  কাজে লাগিয়ে মানুষ উত্তরোত্তর সাফল্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই সাফল্য এমনিতেই এসেছে এমনটি বলা যাবে না।সাফল্য এসেছে অধ্যবসায়ের দ্বারা। কোনো কাজ হয়নি বলে ভবিষ্যৎতে হবে না এমনটিও ভাবা বোকামি। অপরে পারেনি কিন্তু তুমি পারবে এ বিশ্বাসের সাথে চেষ্টা করতে হবে ।তাই বলা যায়, একাগ্রতার সঙ্গে  কাজ  সম্পন্ন করার যে প্রয়াস তাই হল অধ্যবসায়।

সূচনা: মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। জ্ঞান বিবেক-বুদ্ধিকে  কাজে লাগিয়ে মানুষ উত্তরোত্তর সাফল্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই সাফল্য এমনিতেই এসেছে এমনটি বলা যাবে না।সাফল্য এসেছে অধ্যবসায়ের দ্বারা। কোনো কাজ হয়নি বলে ভবিষ্যৎতে হবেনা এমনটিও ভাবা বোকামি। অপরে পারেনি কিন্তু তুমি পারবে এ বিশ্বাসের সাথে চেষ্টা করতে হবে ।একাগ্রতার সঙ্গে  কাজ  সম্পন্ন করার যে প্রয়াস তাই হল অধ্যবসায়। পৃথিবীর কোনো  বড় আবিষ্কার একবারে সফলতার মুখ দেখেনি। বারবার চেষ্টা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করতে হয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনে তাই অধ্যাবসায় ব্যতীত প্রকৃত সাফল্য কোন মানুষই অর্জন করতে পারবে না। ব্যক্তি ,সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আজ অধ্যবসায়কেই সফলতার মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অধ্যবসায় ব্যতীত আমরা কোনভাবেই উন্নত জীবন আশা করতে পারি না।

অধ্যাবসায়ের সংজ্ঞা: প্রতিটি মানুষ জীবনে সফল হতে চায়।কিন্তু সে ভাবে না, সফল কিভাবে হতে হয়। এমনকি আমরা অনেকেই সফল হবার জন্য সহজ পথ খোঁজার চেষ্টা করি। সহজ পথে  অর্জিত কোন কিছু দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আবার কোন কাজ একবার বিফল হলে সে কাজে আর সফল হব না এ রকম ভেবে কাজ ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তাই কোন একটি কাজ একাগ্রতার সঙ্গে এবং এক মোহাবিষ্ট হয়ে প্রকৃত সাফল্য  অর্জন করার যে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা তাকেই অধ্যবসায় বলা যায়। ব্যর্থতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সফলতার চাবি– একথা  বিশ্বাস করে সাফল্য অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হবে।  কবির কথা ভুলে গেলে চলবে না –

পাঁচজনে পারে যাহা,  তুমিও পারিবে তাহা,
পারো কি না, পারো করো যতন আবার।

অধ্যবসায়ের বৈশিষ্ট্য : অধ্যাবসায় ছাড়া আমরা জীবনে কোন ভাবেই সফল হতে পারব না। তবে অধ্যবসায় একক কোনো বস্তু নয়, এটি কয়েকটি গুণের সমষ্টি।  মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা,  পরিশ্রম, ধৈর্য, ,সহিষ্ণুতার ও একাগ্রতা  যদি থাকে তবেই তাকে অধ্যবসায়ী বলা যাবে।  দৃড় মনবল রাখার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রমের ইচ্ছা থাকতে হবে।  উন্নত চিন্তা চেতনার মধ্য দিয়ে  জীবনকে প্রবাহিত করতে হবে।  জ্ঞানে বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।ব্যক্তির মধ্যে থাকতে হবে অবিরাম ছুটে চলার প্রয়াস ও উদ্যম। কোন ব্যক্তির মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে সেই ব্যক্তি যে কোনো বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের পথে ধাবিত হতে পারবে। জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করতে তাই অধ্যবসায়ের কোন বিকল্প নেই। 

অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব : ব্যর্থতাকে  জয় করে তবে সফলতা অর্জন করতে হয়। এই সফলতাকে অর্জন করতে হলে অধ্যবসায়ের বিকল্প কোন কিছু নেই। সুন্দর সুশীতল মানব সভ্যতায়  যা কিছু অবদান তার মূলে রয়েছে অধ্যবসায়। মানুষের জীবনের যেকোনো সময় ব্যর্থতা তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে কিন্তু সেই তমসাচ্ছন্ন সময়কে অতিক্রম করে সফলতার সূর্যকে জয় করাই অধ্যবসায়ী মানুষের একমাত্র লক্ষ্য। অবিরাম চেষ্টায় মানুষ তার নিজের ভাগ্যকে নিজেই পরিবর্তন করতে পারে। আমি যদি চেষ্টা না করে অন্যের উপর নির্ভর করে থাকি তবে সে সফলতা নাও আসতে পারে এমনকি সফলতা আসলেও তার ফল আমার জন্য সুখকর হবে না। প্রতিটি মানুষের অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কঠিন পথ, সাহজ পথে পরিণত করতে হবে। ধর্মীয় গ্রন্থের আলোকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে মানুষের চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে অধ্যবসায় রাখা হয়েছে। চিরদিন মানুষের জীবন শুধু সুখেই কেটে যায় না তাকে দুঃখও পেতে হয়। অপরদিকে কোন মানুষকে শুধু দুঃখ নিয়েই জীবনে বেঁচে থাকতে হয় না, চেষ্টা করলে সে সুখ লাভ করতে পারে। নিজের চিন্তা চেতনা দ্বারা ভাগ্যের পরিবর্তন প্রত্যেকে করতে পারে যদি তার মধ্যে অধ্যবসায়ী  মনোভাবনা থাকে। চিরদিন কারো জীবনে এই আঁধার থাকে না, চেষ্টা থাকলে তার জীবনে আলো আসবেই। সহজভাবে বলতে গেলে আজকের প্রতিযোগিতাপূর্ণ পৃথিবীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এবং সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা স্বীকার করে কিছু অবদান রাখতে গেলে অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। প্রজ্ঞা, জ্ঞান, চেতনা ,ধৈর্য ও  অধ্যবসায় দ্বারা  জীবনকে পরিচালিত করতে হবে। 

সভ্যতা বিকাশে অধ্যবসায়ের ভূমিকা: আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি এমন সাজানো গোছানো পরিপাটি সভ্যতা শুরু থেকেই ছিল না। ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে জানা যায় আমাদের পূর্বপুরুষ বনবাসী ছিলো এবং গুহা অভ্যন্তরে বসবাস করতো। সেই দুর্বিষহ জীবন থেকে উত্তরণের আশায় মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেছে , কোনো ভাবেই নিজের জীবনকে প্রকৃতির কাছে সর্মপন করেনি। লড়াই করেছে যেমন পশুপাখির সঙ্গে তেমনি লড়াই করেছে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের সঙ্গে। একের পর এক পাথর ব্যবহার করে বসবাস উপযোগী স্থান  যেমন তৈরি করেছে তেমনি ভাবে আগুনের ব্যবহার শিখেছে। একের পর এক চেষ্টার মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করলো চাকা যা সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ধারাকে প্রবাহমান  রেখেছে। আজকের পৃথিবী আমাদের যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ উপহার দিয়েছে তার পেছনে রয়েছে অধ্যবসায়ের  অকল্পনীয় অবদান। আমাদের পূর্বপুরুষ  সকল বাধাকে অতিক্রম করে সভ্য সমাজ বিনির্মাণে নিজেদেরকে সচেষ্ট  রেখেছিল তারই বিনিময়ে  আমরা পেয়েছি একটি সুন্দর সভ্যতা। 

অধ্যবসায়ীর জীবনধারা : 

আমরা করব জয়, আমরা করব জয়, আমরা করব জয় নিশ্চয়।
আহা বুকের  গভীর, আছে প্রত্যয় আমরা করব জয় নিশ্চয়।

আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সহজেই অনুমেয় অধ্যাবসায় ছাড়া কোন কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। অধ্যবসায়ী মানুষের মনে একটি জেদ থাকবে এবং বুকের গভীরে থাকবে প্রত্যয় ।যে করেই হোক সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। জীবন সংগ্রামে সাফল্য অর্জনের জন্য অধ্যবসায় হল একমাত্র এবং অনন্য চাবিকাঠি। একজন অধ্যবসায়ী মানুষ সব সময় পূর্বের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে সফল মানুষের প্রতি দৃষ্টি রাখে। পাশ্চাত্য থেকে শুরু করে প্রাচ্য পর্যন্ত এমন অনেক উদাহরণ আমরা অনায়াসেই বলতে পারি যারা অধ্যবসায়ের গুণেই সফল হয়েছেন। অধ্যবসায়ী মানুষের মন যদি কখনো অবসাদগ্রস্থ হয় তবে সে জেগে ওঠার মন্ত্র নেয় পূর্বসূরীদের নিকট থেকে। অধ্যবসায়ী মানুষ যেমন নিয়ম শৃংখলার মধ্যে চলে তেমনি তার চোখে-মুখে একাগ্রতার ছাপ দেখা যায়। অধ্যবসায়ী মানুষ বিশ্বাস করে জীবনে দুঃখ আছে, গ্লানি আছে, পরাজয় আছে, ব্যর্থতা আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়ও আছে। ব্যর্থতাকে পরাজিত করতে হলে অধ্যবসায়ীকে সহিষ্ণুতার সঙ্গে উদ্যম ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। অধ্যবসায়ী মানুষ নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণ করার জন্য মুখের কথা বা গায়ের পেশিশক্তি ব্যবহার না করে কাজকে প্রাধান্য দেয়।

অধ্যবসায়ের উদাহরণ : উদ্যমহীন মানুষকে  উদ্যম ফিরে পেতে  নিয়ে যেতে হয় অতীত এর নিকট কারণ সেখানে তার নতুন শক্তির উৎস ভূমি  নিহিত থাকে।জীবনে যারা সফলতা অর্জন করেছে  তাদের সবাই এক মুহূর্তের মধ্যে সব অর্জন করতে পারেনি, তাকে ধৈর্যের সঙ্গে সফলতার পেছনে ছুটতে হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক  মাশরাফি বিন মোর্তজার  ক্রিকেট সাফল্যের  ইতিহাস যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব বারবার সে হাটুতে অস্ত্রপ্রচার চালানোর কারণে দল থেকে বাদ পড়েছে নিতে হয়েছে বাধ্যতামূলক  ছুটি। তবে হাল ছাড়েনি একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে গেছে। সকল ইনজুরিকে পরাজিত করে সেই হয়েছে বর্তমান বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের সবথেকে সফল অধিনায়ক। মহাকবি ফেরদৌসী তার মহাকাব্য ‘ শাহনামা’ রচনার জন্য সময় নিয়েছিলেন প্রায় ৩০ বছর। মাইকেল মধুসূদন দত্ত লেখক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে শুরুতে ইংরেজি সাহিত্য  রচনা করেন , তবে তিনি সেখানে লেখক স্বীকৃতি পাননি তাই বলে থেমে থাকার কোন প্রশ্নই ওঠে না, লিখেছেন বাংলা কবিতা, বাংলা মহাকাব্য, বাংলা নাটকসহ  অসংখ্য তার সৃষ্টিকর্ম। আজও আমরা মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চলেছি। তার সাফল্যের পেছনে অধ্যবসায়ের প্রভাব রয়েছে। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের কথা আমরা সবাই শুনেছি যিনি যুদ্ধে  বেশ কয়েকবার পরাজিত হয়েও  থেমে যাননি। একের পর এক চেষ্টা চালিয়েছেন, ধৈর্য ধরেছেন, ভুলগুলো শুধরে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন ফলে একটি সময় তিনি অর্ধেক পৃথিবীর অধীশ্বর হয়েছিলেন। অসম্ভব বলে তার কাছে কোনো কিছুই ছিলনা। স্কটল্যান্ড এর রাজা রবার্ট ব্রুস অধ্যবসায়ের আরেক উদাহরণ।ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত হলেও তার লক্ষ্য ছিল কোনো-না-কোনোভাবে ইংরেজ বাহিনীকে পরাজিত করা এবংতিনি একাগ্রতার সঙ্গে যুদ্ধে জয় লাভের জন্য চেষ্টা চালিয়েছেন ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি ইংরেজ বাহিনীকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর  হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলিত করার জন্য প্রাথমিক প্রস্তাবের পর তার উপর ভারতবর্ষের  গোঁড়া হিন্দু সমাজের যে প্রতিবাদ ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল তা তিনি উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন।  দীর্ঘ সময় নিয়ে  একের পর এক যুক্তি উপস্থাপন করে  ভারতীয় হিন্দু সমাজের এই নিষ্ঠুরতার বিপক্ষে ইংরেজ আইনপ্রণেতাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন,  হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীর পুনরায় বিবাহ না হওয়া অত্যন্ত অমানবিক। শেষ পর্যন্ত বিধবা বিবাহ ভারতবর্ষে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রচলন ঘটাতে পেরেছিলেন। স্যার আইজ্যাক নিউটন, আইনস্টাইন সহ পৃথিবীর বড় বড় বিজ্ঞানীরা অধ্যবসায়ের কল্যাণেই পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর আবিষ্কার সমূহ রেখে গেছেন। জগদীশচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ,লালন ফকির, সাহিত্য বিশারদ আব্দুল করিম সহ বহু জগৎ বিখ্যাত মানুষ অধ্যবসায়ের বলে নিজের দেশ তথা বিশ্ব আসনে স্থান করে নিয়েছেন।

ছাত্রজীবনে অধ্যবসায় : জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে গড়ে তুলবার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ছাত্রজীবন। ছাত্রজীবনে আমরা যদি সঠিক পথে থাকি, নিজের কাজটি ঠিকভাবে করি তবে জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। তাই ছাত্র জীবনের সঙ্গে অধ্যবসায়ের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। হতাশ,  অলস  ও পরিশ্রম বিমুখ ছাত্র কখনো সফলতা অর্জন করতে পারবে না। জ্ঞান অর্জনের পথ খুব একটা সহজ নয়। অল্প মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থী অধ্যবসাযয়ের মাধ্যমে খুব ভালো ফল করতে পারে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী নিজের মেধার উপর অগাধ বিশ্বাস রেখে অধ্যাবসায় পরিহার করে, শেষ পর্যন্ত দেখা যায় মেধাবী শিক্ষার্থীর তুলনায় অধ্যবসায়ী কম মেধাবী শিক্ষার্থী সাফল্য অর্জন  করে। ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তিভূমি ছাত্র জীবন তাই এই সময়েই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ভীরুতা  পরিহার করে ধৈর্যের সাথে  অধ্যবসায় চালিয়ে যেতে হবে না হলে ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকারাচ্ছন্ন। যদি পারবো না বলে হাল ছেড়েদেই তখন   আমাদের মনকে প্রশ্ন করতে হবে-  

পারিব না এ কথাটি বলিও না আর
কেন পারিবে না তাহা ভাব এক বার

জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব : ব্যক্তি জীবনের মতই জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব অপরিসীম।আজ নাগরিক জীবনে আমরা সবচেয়ে বেশি যে আবিষ্কারের  দ্বারা  এগিয়ে চলেছি সেটি হচ্ছে বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ আবিষ্কার খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। আলভা এডিসনের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর মানসিকতায় সভ্যতা কে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে এসেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, মহাকাশ নিয়ে গবেষণা, স্যাটেলাইট, টেলিভিশন,ইন্টরনেট এর সুবিধা মানুষের জীবনকে যেমন পরিবর্তন করেছে তেমনি ভাবে জাতীয় জীবনেও পরিবর্তন এনে দিয়েছে।এসব সাফল্যের পেছনে আছে যুগ-যুগান্তরে সাধনা আর একান্ত অধ্যবসায়।  মানুষ এখন একটি জায়গাতে স্থির থাকতে পছন্দ করছে না। তাকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। জাতীয় জীবনের পরিবর্তন আনয়নের ক্ষেত্রে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব রয়েছে। আমরা যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাই দেশ বিভাাগের পরেও দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রামের ইতিহাস। অত্যাচার সহ্য করেও দেশের  স্বাধীনতার কথা কখনোই রাষ্ট্রনায়কেরা ভুলে যাননি। একের পর এক চেষ্টা করে গেছেন যে করেই হোক কাঙ্খিত লক্ষ্যে দেশের মানুষকে নিয়ে যেতে হবে। এই চেতনা থেকেই ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। প্রকৃত পক্ষে এ অর্জন বাঙালি জাতির  দৃড়তা ও অধ্যাবসায়ের ফল।বস্তুত পৃথিবীর বুকে একটি জাতির সগৌরব আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য দেশের সকল নাগরিকের অধ্যবসায়ী হওয়া প্রয়োজন। তাই জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের অপরিসীম বিশেষত্ব রয়েছে।

ব্যক্তি জীবনে অধ্যবসায় : ব্যক্তির সফলতা হয়ে ওঠে  সমাজ ও রাষ্ট্রের সফলতা। একজন ব্যক্তি কখনো কখনো রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্বসেরা দৌড়বিদ  হোসাইন বোল্ড কে আমরা অনেকেই  জানি  আর সেই সুবাদে তার দেশ জ্যামাইকা চিনেছি। ব্যক্তি জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে অধ্যবসায়ের কোন বিকল্প নেই। হতাশ, অলস শ্রেণির মানুষ কখনো ব্যক্তিজীবনে সার্থক হতে পারে না। একজন মানুষ কোন কারণে একটি কাজে ব্যর্থ হওয়া মানেই সে কাজটিই আর পারবেন না এমনটি ভাবা যাবে না। নতুন উদ্যমে আবার শুরু করতে হবে এবং এক পর্যায়ে দেখা যাবে ওই ব্যক্তি ঠিকই সাফল্য অর্জন করবে।নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ কারাভোগে  করেছিলেন বর্ণ বৈষম্য বিলোপের জন্য। তিনি সমকালীন শাসকশ্রেণির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য একাগ্রচিত্তে সংগ্রাম করেছিলেন বলেই তার অবদান সারা পৃথিবীর মানুষ স্মরণ করছে। তাই ব্যক্তিজীবনকে পূর্ণ করতে হলে অধ্যবসায়ের কোন বিকল্প নেই।

প্রতিভা ও অধ্যবসায়: প্রতিভা একটি মানুষের সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিশেষ পারদর্শিতার সম্ভাবনা  যা চর্চার মধ্য দিয়ে  ওই মানুষকে দক্ষ করে  তুলবে। শুধু প্রতিভা থাকলেই  কোনভাবেই আত্মতুষ্টিতে ভোগা যাবে না কারণ প্রতিভাকে সফল করতে হলে বা কাজে লাগাতে হলে অবশ্যই অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। এক  খন্ড লোহা যদি আমরা ব্যবহার না করে  অবহেলায় ফেলে রাখি তাহলে দেখা যাবে ওই লোহা খন্ডে মরিচা পড়ে যাবে। ঠিক একইভাবে কোন প্রতিভাবান শিক্ষার্থী যদি প্রতিনিয়ত অনুশীলনের মধ্যে না থাকে তাহলে তার প্রতিভা এক সময় নষ্ট হয়ে যাবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিভাকে ধরে রাখতে হলে অধ্যাবসায় এর কোন বিকল্প নেই। মানুষের মধ্যে যে সুপ্ত সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে তাকে বিবেক বুদ্ধি দিয়ে বিকশিত করতে হয়। শুধু অসাধারণ প্রতিভা থাকলেই  সফল হওয়া যায় না কারণ তার সাথে প্রয়োজন পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের। বিজ্ঞানী নিউটন, বিজ্ঞানী ডাল্টন, ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার প্রতিভাকে স্বীকার না করে পরিশ্রম এবং অধ্যাবসায় কে গুরুত্ব দিয়েছেন।  অধ্যবসায় ব্যতীত প্রতিভা কখনো প্রতিষ্ঠা পাবে না।

অধ্যবসায় ও সমাজ জীবন :  মানুষ সামাজিক জীব, সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা তার সহজাত স্বভাব। সমাজের সার্বিক বিষয় এক জন ব্যক্তির জীবনাদর্শকে প্রভাবিত করে তাই ওই সমাজের নিয়ম কানুন ব্যক্তি জীবনের ক্ষেত্রে প্রয়োগের মানসিকতা দেখা যায়। একটি সমাজে সামষ্টিক সাফল্য ওই সমাজের ব্যক্তির দ্বারা অর্জিত হয় তাই অধ্যবসায়ের সাথে সমাজ জীবনের নিবিড় সম্বন্ধে রয়েছে। সমাজকে সুন্দর পরিপাটি করে গড়ে তোলে ব্যক্তি। মানুষের আচার-আচরণ সমাজেকে  প্রভাবিত করে। সামাজিক চর্চার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মানসিক দৃঢ়তা যদি বৃদ্ধি করা যায় তবে ওই ব্যক্তি তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে পথ হারাবে না। বিশেষত গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের উন্নয়নের জন্য অধ্যাবসায় একান্ত প্রয়োজন। অধ্যাবসায়ী সমাজে প্রতিটি মানুষ শৈশব থেকেই তার নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে পারে।

অধ্যবসায়ের সাথে সাফল্য অর্জনের সর্ম্পক : প্রতিটি মানুষ জীবনে সফল হতে চায়। নিজের অবস্থান থেকে সাফল্য অর্জন করতে যে কোন উপায় মানুষ সে অবলম্বন করে। আমাদের সমাজে এক ধরনের মানুষ আছে যারা লক্ষ্য স্থির করে কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যথাযথ কাজ করে না আবার কিছুটা কাজ করলেও অল্প সময় যেতে না যেতেই দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর চিন্তা বাদ দেয়। তাই জীবন সংগ্রামে সাফল্য লাভের মূলমন্ত্র অধ্যবসায়। সাফল্য পুরোটাই নির্ভর করবে অধ্যবসায়ের উপর। জীবনে বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে সংগ্রামে জয়ী হওয়া সম্ভব। মানুষের ভাবনা-কল্পনা এবং জীবনের পথ কখনোই একরকম হয়না, বাস্তবতা  ভাবনা কে পেছনে ফেলে মানুষকে  নতুন শিক্ষা দেয়। জীবনের সব কাজে অতি সহজে সমাধান করা যায় না। কিছু কাজ একবারে সফলতা এনে দেয় আবার কিছু কাজ রয়েছে যা একাধিকবার চেষ্টায় অর্জন করতে হয়। তাই সাফল্য লাভের জন্য একমাত্র প্রয়াস অধ্যবসায়।

অধ্যবসায় ও ক্রমবর্ধমান বিশ্ব  : উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা সহজেই অধ্যবসায়ের ফলাফল দেখতে পাই। জাপান , চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ,সিঙ্গাপুর, কানাডা  ,অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত বিশ্বের তালিকায় নিজেদের স্থান করে নিতে পেরেছে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। নতুন নতুন কর্মপরিকল্পনা ও বিজ্ঞানে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যুগোপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে এই দেশগুলো নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কোনো একটি কাজ শেষ করা নির্ভর করে ঐ ব্যক্তির  কর্ম দক্ষতার উপর । উন্নত বিশ্ব মনে করে ব্যক্তি ভেদে কর্মদক্ষতা ভিন্ন হয় তবে কাজটি শেষ করতে হবে যেকোনা ভাবেই। আমরা যেখানে একটি  কাজে অসফল হলেই কাজটি  আর না করার চিন্তা করি সেখানে ক্রমবর্ধমান বিশ্ব অসফল হওয়া কাজের ভুল ত্রুটি সংশোধন করে নতুন করে আবার শুরু করে। তাই আমাদেরকে উন্নত বিশ্বের আদলে অধ্যবসায়ী হয়ে সাফল্য অর্জন করতে হবে।

অধ্যবসায় ও বাঙালি জাতি : আমরা বাঙালি জাতি অনেকাংশে একেবারেই অধ্যবসায়ী বিমুখ। আমাদের মন-মানসিকতার মধ্যে  এই পরম গুণটি অনুপস্থিত। নেই কোনো চেষ্টা, নেই কোনো নতুন কিছুকে বরণ করার শক্তি। অন্যের সমালোচনা, অন্যের কাজে ভুল ধরা আমাদের অন্যতম  স্বভাবজাত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশ্চাত্য বিশ্বের নতুন নতুন আবিষ্কার আমরা ব্যবহার করছি সত্য কিন্তু নিজেরা নতুন কিছু তৈরীর উদ্যোগ গ্রহণ করছি না। অন্যের আবিষ্কারের দিকে চেয়ে থাকি। আমাদের মধ্যে যে প্রাণ শক্তি আছে, আমরাও অধ্যবসায়ী হলে সভ্যতা পরিবর্তনের বিজ্ঞানের ধারাকে কিছু উপহার দিতে পারি এই বিশ্বাস  প্রাণে জাগাতে হবে।বাঙালি স্বভাবকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতার মধ্য দিয়ে বর্ণনা করেছেন এভাবে-     

পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার
সেথা হতে আনে উপহার
                            

আমরা যখন স্বাধীনতা অর্জন করেছি তার সমসাময়িক অর্জিত স্বাধীন দেশ সিঙ্গাপুর ,মালয়েশিয়া আমাদের থেকে অনেক বেশি উন্নতি করেছে শুধু পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়ের দ্বারা। পৃথিবীর এই সাফল্য ও সমৃদ্ধির যুগের আমরা যদি নিজেদের দুরবস্থা থেকে সামনের দিকে এগোতে চায় তাহলে অবশ্যই নীরব সাধনা অধ্যবসায় একান্ত প্রয়োজন যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে  পরিশ্রম।


উপসংহার : আজকের পৃথিবী অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ যেখানে সাফল্য অর্জনের জন্য `DO OR Di’ ব্যতীত অন্য কোন উপায় নেই। তাই আমাদের প্রতিটি মানুষকে অধ্যবসায়ের উপর নির্ভর করে জীবনকে সফল করে তুলতে হবে। অধ্যবসায়ের মত গুণ  আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে আমাদের সেই যাত্রা শুরু করতে হবে। যদি বাস্তবিক অর্থেই আমাদের জীবনে অধ্যবসায়ের চর্চা করতে পারি তাহলে অবশ্যই জীবনের পরিবর্তন ঘটবে, এমন পরিবর্তন যা হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। তাই মনে রাখতে হবে জীবনকে সার্থক করতে হলে অধ্যাবসায় হল একমাত্র পথ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top